আন্দোলনের পর স্বেচ্ছায় মামলা নিতে ট্রাফিক অফিসে ভিড়

নিরাপদ সড়কসহ ৯ দফা দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে যানচলাচলে শৃঙ্খলা আনতে ট্রাফিক সপ্তাহ পালনের ঘোষণা দিয়েছে পুলিশ। এরপর থেকেই রাজধানীসহ দেশের সব জেলায়ই ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ যানবাহনের রুট পারমিট ও ফিটনেস-সংক্রান্ত নথিপত্র পরীক্ষায় মাঠে নামে ট্রাফিক পুলিশ। এরই অংশ হিসেবে ট্রাফিক সপ্তাহের প্রথম দিনের ১৭ ঘণ্টায় সারা দেশে চালকসহ ছোট-বড় বিভিন্ন যানবাহনের বিরুদ্ধে প্রায় ২০ হাজার মামলা দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি আইনি ঝামেলা এড়াতে অনেকেই স্বেচ্ছায় মামলা নিতে ভিড় জমিয়েছেন ট্রাফিক অফিসগুলোয়।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, ট্রাফিক সপ্তাহের প্রথম দিনেই ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে রাজধানীসহ সারা দেশে মোট ১৯ হাজার ৩৬৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ৩ হাজার ৬৫১টি, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) ১ হাজার ৪৭টি, রাজশাহী মহানগর পুলিশ (আরএমপি) ৩৫৭টি, বরিশাল মহানগর পুলিশ (বিএমপি) ১৬২টি, খুলনা মহানগর পুলিশ (কেএমপি) ৬১০টি এবং সিলেট মহানগর পুলিশ (এসএমপি) ২৮৮টি মামলা করেছে। এর বাইরে রংপুর রেঞ্জে ৬৬৯টি, ময়মনসিংহ রেঞ্জে ৬৮৪টি, বরিশাল রেঞ্জে ৭১৫টি, রাজশাহী রেঞ্জে ২ হাজার ২৫৭টি, ঢাকা রেঞ্জে ২ হাজার ৭৭২টি, চট্টগ্রাম রেঞ্জে ২ হাজার ৫৫০টি, খুলনা রেঞ্জে ১ হাজার ৮৫৩টি, সিলেট রেঞ্জে ৭০১টি এবং হাইওয়ে পুলিশ করেছে ১ হাজার ৫০টি মামলা।

পুলিশ সদর দপ্তরের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা জানান, ট্রাফিক সপ্তাহ শুরুর পর থেকেই রাজধানীসহ সারা দেশে যানবাহনের কাগজপত্র যাচাই করা হচ্ছে। বিশেষ করে চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির বৈধ কাগজপত্র এবং ফিটনেস সনদ পরীক্ষা করা হচ্ছে। পাশাপাশি চালক কোনো প্রকার মাদক গ্রহণ করে গাড়ি চালান কিনা, সেটাও যাচাই করে দেখা হচ্ছে।

সরেজমিনে রাজধানীর বেশ কয়েকটি ট্রাফিক অফিস ঘুরে দেখা যায়, স্বেচ্ছায় মামলা নেয়ার জন্য ট্রাফিক অফিসগুলোয় লাইনে দাঁড়িয়েছেন গাড়িচালকরা। বিশেষ করে যে সব চালকের লাইসেন্স নেই, তাদের সংখ্যাই এ লাইনে বেশি দেখা যায়। ডিএমপির ট্রাফিক পশ্চিমের কার্যালয়টি মোহাম্মদপুর পুরান থানার পাশেই। সকাল থেকেই সেখানে জড়ো হতে থাকেন ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের গাড়িচালকরা।

গাড়িচালকরা জানান, নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের শুরু থেকেই ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেসের জন্য তাদের পথে পথে নানা ভোগান্তি শিকার হতে হয়েছে। এ সময় বিআরটিএতে গিয়েও দীর্ঘ লাইনের কারণে লাইসেন্স-সংক্রান্ত কাজ করা সম্ভব হয়নি। এজন্য বাধ্য হয়ে ট্রাফিক অফিস থেকে স্বেচ্ছায় মামলা নিতে চালকরা ভিড় করেছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি সোহেল রানা বণিক বার্তাকে বলেন, ট্রাফিক সপ্তাহ শুরু হয়েছে। এ সপ্তাহ স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালনে পুলিশের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকরাও কাজ করে যাচ্ছেন। এছাড়া এ কাজে চালকরাও সহযোগিতা করছেন। এবারের ট্রাফিক সপ্তাহের প্রধান্য উদ্দেশ্য নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।

গত ২৯ জুলাই দুপুরে বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাসের চাপায় শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র আবদুল করিম ওরফে রাজীব (১৭) এবং একই কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্রী দিয়া খানম মিম (১৬) নিহত হয়। এছাড়া আহত হয় আরো ১২ শিক্ষার্থী। দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোয় অবস্থান নিয়ে গাড়ির কাগজপত্র ও চালকের লাইসেন্স পরীক্ষা করতে শুরু করে। ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি আটকে দেয় তারা। শিক্ষার্থীরা সড়কে অবস্থান নেয়ায় কার্যত অচল হয়ে পড়ে রাজধানী। এরপর পুলিশের পক্ষ থেকে ট্রাফিক সপ্তাহ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে যাওয়ার জন্য বলা হয়।

গত রোববার রাজধানীর গুলিস্তানের জিরো পয়েন্টে ট্রাফিক সপ্তাহের উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী ও ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*