৪৩ মাস বেতন বন্ধ : প্রশিকা কর্মীদের জীবন দুর্বিষহ

0
555

মেরী হালদার। মাত্র ১২শ’ টাকা বেসিক বেতনে বেসরকারি সংস্থা প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রে কর্মরত। এই বেতনেই বাসা ভাড়া, ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পাঠানো, নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য কেনা সব করতে হতো। তারপরও চলছিল দিন। কিন্তু জীবন ধীরে ধীরে দুর্বিষহ হয়ে উঠে যখন আটকে যায় বেতন।

বেতন দাবিতে রাজধানীর মিরপুরে প্রশিক্ষার প্রধান কার্যালয়ে অবস্থান কর্মসূচিতে বসা মেরীর সঙ্গে কথা বলতেই কেঁদে ফেলেন তিনি। মেরি বলেন, দীর্ঘ দিন বেতন না হওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে ছেলে-মেয়ের স্কুল। ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছে তারা। এখন হতাশাগ্রস্ত জীবন নিয়ে ছেলেটা বিপথগামী। এমনিতেই কম বেতন পেতাম। তার মধ্যে টানা দেড় থেকে দু বছর বেতন না হলে কেমনে চলি ভাই বলেন।’কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ছেলের দোষ কী?, খাওয়াতে পারি না, পড়াশোনার খরচ দিতে পারি না। ওনার (কাজী ফারুক) ছেলে-মেয়েরা তো বিদেশে পড়ালেখা করে। অথচ আমাদের ন্যায্য পাওনাটুকুও দেয় না।

প্রশিকার সাবেক চেয়ারম্যান কাজী ফারুকের ব্যক্তিগত গাড়ি চালক হিসেবে কাজ করেছেন আবদুল হক। টানা ২৪ বছর এই কাজে নিয়োজিত ছিলেন তিনি। গত বছর কয়েক দিন অসুস্থ থাকায় ডিউটি করতে পারেননি। এতেই বেতন বন্ধ হয়ে যায় আবদুল হকের। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, কাজী ফারুকের ছেলে মেয়েকে আমিই স্কুল-কলেজে নিয়ে গেছি। টানা ২৪ বছর একজনের সঙ্গে চলাফেরা করা চাট্টিখানি কথা নয়। অথচ মানুষ কি করে এত নির্দয় হয়, পাষাণ হয়। সব মিলিয়ে ৩৬ মাসের বেতন পাই আমি। সর্বশেষ বেতন থেকে কিছু টাকা দেয়া হয়েছিল গত জানুয়ারিতে।

মেরী বা আবদুল হকের মতো দীর্ঘদিন বেতন না পেয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন প্রশিকার কর্মীরা। এদের মধ্যে অনেকেই সর্বোচ্চ ৪৩ মাস থেকে সর্বনিম্ন ১৩ মাস বেতন পান না। কিন্তু জীবন তো আর চলে না। তাই বাধ্য হয়ে বেতনের দাবিতে নেমেছেন অবস্থান কর্মসূচিতে। মিরপুরের প্রশিকার প্রধান কার্যালয়ের প্রবেশদ্বারে তাদের এই অবস্থান কর্মসূচি। সোমবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, এভাবেই টানা ৬৪ দিন সিঁড়িতে বসে কাটিয়ে দিয়েছেন প্রশিকার প্রায় ৩০০ কর্মী। পল্লবী থানা পুলিশের মধ্যস্থতায় ঈদের আগে কয়েক মাসের বেতন দেয়ার আশ্বাস দেয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রোববার সেই টাকা দেয়ার কথা থাকলেও দেয়নি। এ বিষয়ে কেউ সর্বশেষ তথ্যও জানায়নি। বাধ্য হয়েই সবাই বসে রয়েছেন।

সিঁড়িতে অবস্থান করা বিভিন্ন পদে কর্মরতদের মধ্যে সেজারাতুন্নাহার রুমী বেতন পান না সাড়ে ৩ বছর। খাদিজা আক্তার দেড় বছর। টানা ২৫ বছর চাকরি করেছেন আবদুর রহিম। তার বকেয়া পড়েছে টানা ৩৬ মাসের বেতন। এর সঙ্গে ১২টা বোনাস, মহার্ঘ ভাতা, গ্র্যাচুইটি সবই নিয়ম অনুসারে প্রাপ্য তার। কিন্তু এসবের অনিশ্চয়তায় জীবন এখন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে বলে জানান তিনি। কথা হয় এই এনজিওর উচ্চ পদে কর্মরত কৃষিবিদ শাহ আলমের সঙ্গে। তিনি জানান, ‘যাদের বেতন একটু কম, তাদের বেতন তবুও হয়েছে। কিন্তু যাদের বেশি, তাদের বেতন একেবারেই আটকে দিয়েছে। আমার বেতন হয় না টানা ৪২ মাস। জীবন চলছে এখন আশায় আশায়। সঞ্চয় ভেঙে, জমি বিক্রি করেও জীবনযাত্রার ব্যয় যখন মেটানো যাচ্ছে না তখন ধার দেনা করা ছাড়া উপায় কি।’বলেন শাহ আলম।

জানা গেছে, প্রশিকার তৎকালীন চেয়ারম্যান কাজী ফারুক রাজনৈতিক দল গঠন করে ২০০৯ সালে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেন। ’ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলন’নামের তার দলের তালাচাবি মার্কায় নির্বাচন করা প্রার্থীদের ৩০০ আসনেই ভরাডুবি হয়। এই নির্বাচনে প্রশিকার অর্থ বেআইনিভাবে খরচ করেন তিনি। একই সঙ্গে ব্যাপকভাবে কর্মী ছাঁটাইও শুরু করেন। এসব অভিযোগে এক পর্যায়ে প্রশিকার গভর্নিং বডি তাকে চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে দেন। উচ্চ আদালতে গিয়েও সুবিধা করতে পারেননি তিনি। পরবর্তীতে ২০১২ সালের ২০ মে কাজী ফারুক আবার প্রশিকার দখল নেন। এরপর আদালত অবমাননার দায়ে তার জেলও হয়। একই সঙ্গে বর্তমান গভর্নিং বডি বহাল রাখারও নির্দেশ দেয় আদালত। কিন্তু আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন তিনি, যার শুনানি এখনও হয়নি। ফলে কাজী ফারুকের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে প্রশিকা।

এ প্রসঙ্গে কর্মীদের আন্দোলনের সমন্বয়ক ও উপ-পরিচালক (ফিল্ড আপারেশন) জাকির হোসেন বলেন, ‘গ্র্যাচুইটিসহ বিভিন্ন ফান্ড মিলিয়ে অবস্থানরত কর্মীরা গড়ে কমপক্ষে ১৫ লাখ টাকা করে পাবেন। এছাড়া একেক জনের গড়ে ৭ থেকে ২২ লাখ টাকা করে বেতন আটকা রয়েছে। এই যুগে কিভাবে তারা চলছেন এটি একবারও কি ভাবলেন না চেয়ারম্যান।’ তিনি বলেন, কাজী ফারুকের স্বেচ্ছাচারিতা, নিজস্ব প্রবিধান কায়েম করার কারণে আজ স্বনামধন্য এই এনজিওটির এই অবস্থা। আমরা আমাদের ন্যায্য পাওনা পেতে সরকারের সহযোগিতা চাই।

বিজ্ঞাপন...

কবিরাজ: তপন দেব ।

নারী-পুরুষের সকল জটিল ও গোপন রোগের চিকিৎসা করা হয়। দেশে ও বিদেশে ওষুধ পাঠানো হয়।

আপনার চিকিৎসার জন্য আজই যোগাযোগ করুন - ০১৮২১৮৭০১৭০ (সময় সকাল ৯ - রাত ১১ )

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here