সেই অন্তঃসত্ত্বা ইউএনওকে ওএসডি ঘটনায় যে পদক্ষেপ নিলেন প্রধানমন্ত্রী - Bd Online News 24
Home » লাইফষ্টাইল » সেই অন্তঃসত্ত্বা ইউএনওকে ওএসডি ঘটনায় যে পদক্ষেপ নিলেন প্রধানমন্ত্রী

সেই অন্তঃসত্ত্বা ইউএনওকে ওএসডি ঘটনায় যে পদক্ষেপ নিলেন প্রধানমন্ত্রী

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা হোসনে আরা বেগম বীনাকে ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) করার বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ গণমাধ্যমে বেশ আলোচিত ইউএনও হোসনে আরা বেগম বীনা।

দীর্ঘ ৯ বছরের দাম্পত্য জীবনে প্রথম মা হয়েও সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারছেন না তিনি।

জন্মের দিন থেকেই হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে অপরিপক্ক শিশুটিকে।

নিজের নিষ্পাপ সন্তানের কী দোষ ছিল এমন আর্তি জানিয়ে গত ৮ ফেব্রুয়ারি রাতে ফেসবুকে একটি আবেগঘন স্ট্যাটাস দেন ইএনও হোসনে আরা বেগম বীনা।

এরপরই যুগান্তর অনলাইন তার স্ট্যাটাসটিসহ খবর প্রকাশ করলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ দেশ জুড়ে সমালোচনা শুরু হয়।

এরপর প্রশাসনে তোলপাড় শুরু হয়। বীনার ওএসডি করার সংবাদ যুগান্তরসহ অন্যান্য গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে তা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নজরে আসে।

আজ (সোমবার) তিনি জনপ্রশাসন সচিব ফয়েজ আহাম্মদকে বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

এর আগে রোববার হোসনে আরা বীণাকে টেনশনমুক্তভাবে বিশ্রামে থাকতেই ওএসডি করা হয়েছে বলে জানিয়েন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এপিডি) শেখ ইউসুফ হারুন।

তিনি যুগান্তরকে বলেছিলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিষয়টি আমরা দেখেছি। সামনে যেহেতু উপজেলা নির্বাচন, মূলত তার ওপর মানসিক চাপ কমাতে এবং টেনশনমুক্তভাবে বিশ্রামে থাকতে পারেন সে জন্য ওএসডি করা হয়েছে। অন্য কোনো কারণ নেই।’

বিষয়টি অনাকাঙ্খিত বলেও মন্তব্য করেন শেখ ইউসুফ হারুন।

হোসনে আরা বীণার ওই স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো -‘আমি ব্যক্তিগত বিষয়গুলো সাধারণত ফেসবুকে খুব একটা শেয়ার করি না। তবে আজ মনে হলো এখন চুপ করে থাকাটাও অন্যায়। তাই আজ আর না, আজ আমি বলবো… আমি হোসনে আরা বেগম, উপজেলা নির্বাহী অফিসার নারায়ণগঞ্জ সদর, মাত্র ৯ মাস পূর্বে আমি এ পদে যোগদান করি।

আমার দীর্ঘ ৯ বছরের দাম্পত্য জীবনে বহু চেষ্টা চিকিৎসার পরও আমরা কোনো সন্তান লাভ করতে পারিনি। কিন্তু পাঁচ মাস পূর্বে আমি জানতে পারি আমি দুই মাসের সন্তানসম্ভবা। এ ঘটনা আমার জীবনে সৃষ্টিকর্তার অপার রহমত ছাড়া আর কিছুই নয়, এ বিশ্বাস আমি প্রতিনিয়ত বুকে ধারণ করেছি। এ বিশ্বাস ও স্বপ্ন বুকে নিয়ে অনাগত সন্তানের আগমনের অপেক্ষায় দিন গুনছিলাম।

উল্লেখ্য আমি আমার বাবুকে পেটে নিয়েই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করি।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে আমি নারায়ণগঞ্জ-৪ ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের আংশিক নির্বাচন অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করি।

একজন নারী কর্মকর্তা হিসেবে অজুহাত, ফাঁকিবাজী এই বিষয়গুলোকে কখনই পুঁজি করিনি। যখন যে পদে কাজ করেছি চেষ্টা করেছি শতভাগ নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে। সন্তানসম্ভবা হয়েও এর কোনো ব্যতিক্রম আমি করিনি।

অথচ আমি সন্তান সম্ভবা হয়েছি শোনার পর থেকেই একজন বিশেষ কর্মকর্তা, যার নাম বলতেও আমার রুচি হচ্ছে না, বিভিন্ন মহলে আমাকে অযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করে আমাকে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা থেকে বদলীর পায়তারা করেই চলেছিল।

আমার সন্তান সম্ভবা হওয়াটাকেই সে বিভিন্ন মহলে আমার সবচেয়ে বড় অযোগ্যতা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। অথচ এই সন্তান পেটে নিয়েই আমি অত্যন্ত সফলভাবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এতে আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক এপ্রিসিয়েশনও পেয়েছি।

আমার সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ ছিল এপ্রিলের ২০ তারিখ, তেমন মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই আমি ছিলাম। গত ৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে রেগুলার চেকআপ করতে আমি হাসব্যান্ডসহ স্কয়ার হাসপাতালে আসি।

চেকআপ শেষে সন্ধ্যায় আমরা হাসপাতালে অপেক্ষা করছি পরবর্তী পরীক্ষার জন্য, এমন সময় আমার একজন ব্যাচমেট ফোন করে জানায় আমার সদাসয় কর্তৃপক্ষ আমাকে ওএসডি করেছে অর্থাৎ আমাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করেছে।

আমার অপরাধ হলো আমি সন্তান সম্ভবা। আর তার চেয়েও বড় কারণ হলো সেই তথাকথিত ক্ষমতাধর কর্মকর্তার উপরের মহল কর্তৃক তদবির।

খবরটা শোনার পর আমি প্রচণ্ড মানসিক চাপ সহ্য করতে পারিনি। আমি অ্যাজমার রোগী। প্রচণ্ড মানসিকচাপে আমার ফুসফুসে ব্লাড সার্কুলেশন অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়, ফলে আমার পেটের সন্তানের অক্সিজেন সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যায় এবং হঠাৎ করেই আমার পেটের বাবু নড়াচড়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়।

তাৎক্ষণিক হাসপাতালে ভর্তি করা হলে ডক্টর সেদিন রাতেই সিজার করে বাবু বের করে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। পরে আমার পরিবারের সবার সিদ্ধান্তে পরদিন সকালে আমার মাত্র ৩১ সপ্তাহ বয়সী প্রি-ম্যাচিউর বেবিকে সিজার করে বের করে ফেলা হয়। এখন সে স্কয়ার হাসপাতালের এনআইসিওতে বেঁচে থাকার জন্য প্রাণপণ যুদ্ধ করে যাচ্ছে।

আমার এই নিষ্পাপ সন্তানটার কী অপরাধ ছিল? নাকি মা হতে চাওয়াটাই আমার সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিল আমি জানি না!

তবে জানি একজন সব দেখেন তিনি আমার নিষ্পাপ মাসুম সন্তানের উপর এই জুলুমের বিচার করবেন। এই নিষ্ঠুর অমানবিকতার পৃথিবীতে কোনো কর্তা ব্যক্তিদের কাছে আমি এ অন্যায়ের বিচার চাই না, শুধু আমার সৃষ্টিকর্তাকে বলব তুমি এর বিচার করো!

আর যারা আমাকে একটুও ভালোবাসেন আমার নিষ্পাপ সন্তানটার জন্য দোয়া করবেন। ও সুস্থ হয়ে গেলে কোনো কষ্টের কথাই আমার মনে থাকবে না।’

Leave a Reply