‘গলায় পাড়া দিয়ে যা করা লাগবে তাই করব’

রাজধানীর কামরাঙ্গীর চর থানা ছাত্রলীগের নেতাদের ‘গলায় পাড়া’ দেওয়ার হুমকি দিলেন কামরাঙ্গীর চর থানার ওসি শাহিন ফকির। ঢাকা-২ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ও কেরানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদের অনুসারী নেতাকর্মী ও তাদের অভিভাবকদের সম্প্রতি থানায় ডেকে নিয়ে এ হুমকি দেওয়া হয়।

স্থানীয় এমপি ও খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের পক্ষ নিয়ে ওসি বলেন, এ অবস্থান প্রশাসনেরও। ওসি উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদের সমর্থক থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাইদুর রহমান রতনসহ ছাত্রলীগ নেতাদের বাড়ির ইট খুলে নেওয়াসহ মাদক মামলায় গ্রেপ্তারসহ ক্রসফায়ার দেওয়ার হুমকি দেন। উপস্থিত ছাত্রনেতাদের মধ্যে ছিলেন ছাত্রলীগ নেতা সাইদুর রহমান, থানা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক এম এইচ মাসুদ মিন্টু, মো. মোরসালীন হোসেন ও তাঁর বাবা মঞ্জুর হোসেন, মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সহসভাপতি আব্দুর রহমানের বাবা আব্দুল আজিজ। ওসি বারবার হুমকি দেন, নিরাপদে থাকতে চাইলে ছাত্রলীগ নেতাদের উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদের সঙ্গ ছাড়তে হবে; চেয়ারম্যানেরও কামরাঙ্গীর চর আসা চলবে না, কারণ তিনি কেরানীগঞ্জ উপজেলার চেয়ারম্যান।

এই হুমকি-ধমকির অডিও সম্পর্কে জানতে গতকাল রাতে যোগাযোগ করা হলে ওসি শাহীন ফকির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আপনার কাছে ডকুমেন্ট থাকলে যা পারেন লিখে দেন।’ সংসদীয় আসনের প্রার্থিতার আশায় শাহীন আহমেদ প্রচারণা চালাতে পারবেন না কেন—এ প্রশ্নর উত্তরে ওসি বলেন, ‘উপজেলা চেয়ারম্যান থাকাকালে সে নির্বাচনী ক্যাম্পেইন করতে পারে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘সে আমার কেউ না, সে এলাকায় আসতে পারে না, পারবে না।’

কালের কণ্ঠ’র কাছে আসা অডিও রেকর্ড থেকে :

ওসি : আপনারা তো গার্ডিয়ান। গার্ডিয়ানদের বলি। ওদের এটা নষ্ট করতেছে কিন্তু ওই যে রতন। আপনারা বিপদে পড়বেন। আপনারা বিপাকে পড়বেন। ঘরে টিকতে পারবেন না। আপনার ছেলের সেম মেসেজ।

ছাত্রলীগ নেতা : ভাই (চেয়ারম্যান) তো আমাদের কোথাও নিয়ে যায় না। আমরা স্যার বিপদে পড়ার মতো কোনো কাজ করি না।

ওসি : অবশ্যই করো। এই কামরাঙ্গীর চরের থেকে তোমরা ভাগো। যদি তোমাদের রাজনীতি করার ইচ্ছে থাকে তাহলে ওই পারে যাও। এই কামরাঙ্গীর চরে যদি টুঁ শব্দ হয় গলায় পাড়া দিয়ে যা করা লাগবে তাই করব।

ছাত্রনেতা : রাজনীতি করলে সমস্যা কি?

ওসি : এক শ পার্সেন্ট সমস্যা।

ছাত্রনেতা : অপরাধ দেখতে হবে না?

ওসি : অপরাধ বলতে কি আমি ওসি বুঝি। তোমাদের ডুবাবে ওই লোক। তোমাদের ডুবাবে মিন্টা। শাকিল্লা। কোথার থেকে ইয়া আসে আমি দেখব। আমি হলাম ওসি।

ছাত্রনেতা : অপরাধ কী আমাদের?

ওসি : পিরিত করতে যাও, ওখানে (অশ্রাব্য গালি) যাও।

ছাত্রনেতা : এটা তো কোনো অপরাধ হতে পারে না।

ওসি : অবশ্যই। ওই শালা… এখানে কে? ওই কুত্তার বাচ্চা এখানে কে?

ছাত্রনেতা : এগুলা আমাদের জিজ্ঞেস করে লাভ আছে?

ওসি : এই পারে পোস্টার লাগাবে রাজনীতি করবে! যা প্রেসার আমার ওপর।

ছাত্রনেতা : পোলাপান তো এরা বোঝে না।

ওসি : আমি বুঝি না কে কী করে?

ছাত্রনেতা : রক্ত-মাংসের মানুষ স্যার।

ওসি : ঠিক আছে। আমার প্রশাসনেরও একই কথা। উনি এইখানের কেউ না। ওই পারে যাইয়া থাকুক, ঘুমাক, যত রাজনীতি সব করুক। কিন্তু এই পারে হবে না। এই পারে থাকলে দেখা গেছে যে আর দুইটা ছেলের হয়রানি হবে। আর দুটা পরিবারের হয়রানি হবে। দরকার কি!

ছাত্রনেতা : রাজনীতি না জানলে কি এত দূর আসতে পারত?

ওসি : আর ধুরা। লেইখ্যা রাখ আমি সার্টিফিকেট দিয়ে দিলাম। জীবনে পাবে না (মনোনয়ন)। সে ইস্তফা দিয়ে তার পর আসুক। দেখা যাবে উপজেলা চেয়ারম্যানিত্বও থাকবে না। হারাবে। যদি আমার এলাকায় রাজনীতির ‘র’-এরও গন্ধ পাই, তাহলে একদম পাড়ায়ে মারা যেটা সেটা করব।

ছাত্রনেতা : কামরাঙ্গীর চরে শাহীন চেয়ারম্যানের শুভাকাঙ্ক্ষী আমরা একা না।

ওসি : যারাই থাকুক না কেন। তোমারে যেহেতু দেখা গেছে ডাকছি; ওই শাহীন চেয়ারম্যান পারলে পোস্টার লাগাক। পারলে গলায় জুতার মালা দিয়ে দেখাব। রাজনীতি করো শেখ হাসিনার ছবি দেখাইয়া, গঠনতন্ত্র বোঝ না। যে ঘুরঘুর করে তারাই দেখবা যে দূরে সরে গেছে। যখন পত্রটা (মনোনয়নপত্র) আসবে কে পাইল কে পাইল না—তখনই দেখবা কী কাণ্ডটা হয়। সে জন্য আগেভাগে রাস্তা ঠিক করো।

ছাত্রনেতা : ভাই নমিনেশন কে পাবে এখনো ঠিক হয় নাই।

ওসি : তুমি লেইখা নাও আমি বললাম। আমি ওসি তো। ওসিগিরি ছেড়ে দিব, উনি যদি নমিনেশন পায়।

ছাত্রনেতা : তাহলে কে পাবে?

ওসি : এই কামরুলই পাবেন; কামরুল।

ছাত্রনেতা : আরো ছয়-সাত মাস বাকি আছে না?

ওসি : কামরুলই পাবে। দেখা যাবে, রাস্তায় যদি না আসো, ঘরের ইটও থাকবে না।

ছাত্রনেতা : কামরুল পাইলে আমাদের আর শাহীন চেয়ারম্যানরে কি লাগবো না?

ওসি : শাহীন চেয়ারম্যানরে… দিয়েও গুনবে না।

ছাত্রনেতা : এত সহজ?

ওসি : অ-অ-অ, টের পাবা।

ছাত্রনেতা : জনপ্রিয়তাও নাই উনার? আমরা তো রাস্তায় ঘুরি। মন্ত্রীর কী জনপ্রিয়তা আছে?…শাহীন চেয়ারম্যানের ঘটনা এক বছর ধরে। তার আগে থেকে আমাদের কেন বঞ্চিত করে রাখছে?

ওসি : আমি এক পার্সেন্টও ছাড় দেব না। আমার যে হুকুম আদেশ আছে, আমি সেটাই পালন করব।

ছাত্রনেতা : অপরাধটা কী আমাদের?

ওসি : শাহীন চেয়ারম্যানের রাজনীতি করলে ওই পারে যাই করতে হবে।… শাহীন চেয়ারম্যান তো মেট্রোর বাইরে। তারে নিয়া হিসাব কেন করো? সে তো মেট্রোর কেউ না, কামরাঙ্গীর চরের কিছু না।

ছাত্রনেতা : হাজার হাজার নেতাকর্মী আছে শাহীন চেয়ারম্যানের।

ওসি : দেখা গেছে যে পরিশ্রম করে অনেকে কাজ করে, যাদের যোগ্যতা আছে প্রেসিডেন্ট হওয়ার, ওদেরকে দেয় নাই কিসের জন্য? একাট্টা যদি হয়ে যায় তাহলে হার্মফুলও হয়ে যেতে পারে। এটাই হলো রাজনীতি।… সুতরাং আমরা এই থানা এই এলাকায়, এটাই হলো লাস্ট মেসেজ, তোমার পেছনে যারা সবাইকে বোঝাইয়া দিবা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*